আজ থেকে প্রায় দেড় হাজার বছর পূর্বে আরবের মরুদুলাল, রহমাতুল্লিল আলামীন, হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা (সা.) বিশ্ববাসীর ইহকালীন শান্তি ও পরকালীন মুক্তির লক্ষ্যে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে যে ঐশী বাণীর শুভ সূচনা করেছিলেন, তা হলো শান্তির ধর্ম ‘আল-ইসলাম’। তাঁর নবুয়তের জ্যোতি বা ‘নূরে’ গোটা জাহান আলোকিত হয়ে ওঠে। দিশাহারা মানবজাতি ইসলামের সাম্য ও মৈত্রীর মহান আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে দলে দলে প্রিয় নবীর (সা.) পতাকাতলে সমবেত হতে থাকে। ‘সুফি সাধকদের পুণ্যভূমি’ হিসেবে খ্যাত বাংলাদেশে ইসলামের প্রচার ও প্রসারের ইতিহাস কেবল ধর্মান্তরের ইতিহাস নয়, বরং এটি মানবপ্রেম ও সাংস্কৃতিক জাগরণের এক অনন্য উপাখ্যান। দ্বাদশ শতাব্দী থেকে এই ভূখণ্ডে সুফিবাদের যে জোয়ার আসে, তা জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বাঙালির মানস গঠনে অপরিসীম ভূমিকা রেখেছে। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও ইসলামের আগমন বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের মতো বাংলাদেশেও ইসলামের শান্তির বাণী পৌঁছায় সুফি-দরবেশ ও আউলিয়ায়ে কেরামের হাত ধরে। ইতিহাস অনুযায়ী, ৬৯০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে সাহাবী-এ-রাসূল হযরত সা’দ বিন আবি ওয়াক্কাস (রা.)-এর আগমনের মধ্য দিয়ে এই অঞ্চলে ইসলামের প্রথম সোপান রচিত হয়। পরবর্তীতে দ্বাদশ শতাব্দীতে সুলতানুল হিন্দ হযরত খাজা মঈনউদ্দিন চিশতি (রহ.)-এর মতো আধ্যাত্মিক পুরুষদের প্রভাবে এই ধারা বেগবান হয়। তাঁরা জাঁকজমকপূর্ণ পোশাক বা তলোয়ারের জোরে নয়, বরং সাদামাটা জীবনযাপন, বিনয় এবং ভালোবাসার মাধ্যমে মানুষের হৃদয় জয় করেছিলেন। তৎকালীন সমাজের কঠোর বর্ণপ্রথা ও সামাজিক বৈষম্যের বিপরীতে তাঁরা শক্তিপ্রয়োগের পরিবর্তে সাম্য, মৈত্রী ও উত্তম চরিত্রের মাধুর্য দিয়ে মানুষকে কাছে টেনেছিলেন।
রূপকল্প: বাংলাদেশের বহুত্ববাদী ও আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের প্রধান অভিভাবক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা এবং উগ্রবাদী আদর্শের মোকাবিলা করে একটি সম্প্রীতিময় সমাজ বিনির্মাণ করা।
লক্ষ্য: নিরাপত্তা বিধান, আইনি সুরক্ষা, তথ্য-উপাত্ত সংরক্ষণ এবং সংস্কার কার্যক্রমের মাধ্যমে দেশব্যাপী সুফি মাজারগুলোর ঐতিহ্য রক্ষা করা।
সুফি সাধকদের পুণ্যভূমি’ হিসেবে খ্যাত এই বাংলাদেশে ইসলামের প্রচার ও প্রসারের ইতিহাস কেবল ধর্মান্তরের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি মানবপ্রেম, সাম্য ও এক অভূতপূর্ব সাংস্কৃতিক জাগরণের অনন্য উপাখ্যান। দ্বাদশ শতাব্দী থেকে এ ভূখণ্ডে সুফিবাদের যে জোয়ার আসে, তা জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে আপামর বাঙালির মানস গঠনে অপরিসীম ভূমিকা রেখেছে। সুফি সাধকরা অনুধাবন করেছিলেন যে, আধ্যাত্মিকতার মূল বাণী মানুষের হৃদয়ে গেঁথে দিতে হলে প্রয়োজন শর্তহীন ভালোবাসা। তাই তৎকালীন সমাজের কঠোর বর্ণপ্রথা ও তীব্র সামাজিক বৈষম্যে নিষ্পেষিত সাধারণ মানুষ যখন দিশেহারা, তখন এই দরবেশগণ তরবারি বা শক্তিপ্রয়োগের বদলে সাম্য, মৈত্রী ও নিজেদের উত্তম চরিত্রের মাধুর্য দিয়ে তাদের আপন করে নিয়েছিলেন। জাঁকজমকপূর্ণ পোশাক পরিহার করে তাঁদের বিনয়ী ও সাদামাটা জীবনাচরণ এ অঞ্চলের প্রান্তিক ও অবহেলিত জনগোষ্ঠীকে আত্মমর্যাদার নতুন পথ দেখিয়েছিল।
বর্তমান বাংলার ৬৪টি জেলাজুড়েই এই মহান সাধকগণের স্মৃতি ও পবিত্র মাজার ছড়িয়ে আছে, যা গোটা দেশকে যেন একটি আধ্যাত্মিক মানচিত্রে পরিণত করেছে। হযরত সুফী সৈয়দ নাসির উদ্দীন ইরাকী (রহ.), সিলেটের হযরত শাহজালাল মুজাররদ ইয়ামেনী (রহ.) ও তাঁর ৩৬০ আউলিয়া, বাগেরহাটের হযরত খান জাহান আলী (রহ.) এবং চট্টগ্রামের বারো আউলিয়া এই আধ্যাত্মিক কাঠামোর মূল ভিত্তি স্থাপন করেন। তাঁদের এই আধ্যাত্মিক মিছিলে একে একে শামিল হয়েছেন হযরত শাহ সুলতান রুমী (রহ.), হযরত শাহ মখদুম রূপোস (রহ.), হযরত শাহ আলী বোগদাদী (রহ.) এবং হযরত শাহ আমানত (রহ.)-এর মতো কালজয়ী মনীষীরা। তাঁরা শুধু ধর্মপ্রচারই করেননি, বরং দীঘি খনন, রাস্তা নির্মাণ ও লঙ্গরখানা স্থাপনের মাধ্যমে সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষের জন্য বাস্তবমুখী কল্যাণকর কাজও করে গেছেন।
তাঁদের স্মৃতিবিজড়িত দরগাহ ও মাজারগুলো কেবল ইবাদত বা জিয়ারতের স্থান নয়; এগুলো আমাদের দীর্ঘদিনের ধর্মীয়, আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই মহামূল্যবান ঐতিহ্যকে রক্ষা করা এবং সুফিবাদের প্রকৃত দর্শন সমাজে ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়েই 'বাংলাদেশ দরগাহ মাজার জাতীয় সমন্বয় কমিটি' কাজ করে যাচ্ছে। আমাদের এই ওয়েবসাইটটি দেশের সকল পীর-মাশায়েখ, খাদেম এবং আশেকানদের জন্য একটি উন্মুক্ত প্ল্যাটফর্ম। এখানে আপনারা আমাদের কমিটির চলমান কার্যক্রম, দিকনির্দেশনা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে নিয়মিত আপডেট পাবেন।
আসুন, আওলিয়া-এ-কেরামদের দেখানো শান্তি, সাম্য ও মানবতার পথে হেঁটে আমরা নিজেদের আত্মশুদ্ধি এবং একটি সুন্দর, সম্প্রীতির বাংলাদেশ গড়ে তুলি। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদের সহায় হোন।